শেখ হাসিনা ও ফ্যাসিবাদ: বিতর্ক, সমালোচনা ও জুলাই আন্দোলনের প্রভাব,

ফ্যাসিবাদ কী?

ফ্যাসিবাদ (Fascism) হলো একটি রাজনৈতিক মতবাদ ও শাসনব্যবস্থা, যেখানে—

একক নেতা বা একটি দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে,

বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমন করা হয়,

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়,

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।

২০শ শতকের শুরুতে ইতালির বেনিতো মুসোলিনি ও জার্মানির অ্যাডলফ হিটলারের সময় এই শব্দটি বিশেষভাবে পরিচিত হয়।


---


শেখ হাসিনা ও ফ্যাসিবাদের অভিযোগ::


২০০৯ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তবে দীর্ঘ শাসনকাল নিয়ে বিভিন্ন সময় তাঁকে “ফ্যাসিস্ট” আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

সমালোচকদের অভিযোগ


1. একক নেতৃত্ব – আওয়ামী লীগকে একক আধিপত্যশালী দলে পরিণত করা।

2. বিতর্কিত নির্বাচন –

২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি, ১৫৪ আসনে ভোট হয়নি।

২০১৮ সালে ভোট কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

২০২৪ সালে প্রধান বিরোধী দল অংশ নেয়নি, ফলে প্রতিযোগিতা সীমিত ছিল।

3. মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ – সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা দমন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ।

4. বিরোধী দমন – বিরোধী দলের হাজারো নেতাকর্মীর গ্রেফতার।

5. ছাত্র আন্দোলন দমন – নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (২০১৮), কোটা সংস্কার আন্দোলন (২০১৮), এবং সর্বশেষ জুলাই আন্দোলন (২০২৪) সহিংসভাবে দমন করা হয়।



---


জুলাই আন্দোলন ২০২৪: নতুন প্রজন্মের বিদ্রোহ

আন্দোলনের সূচনা

২০২৪ সালে সরকার পুনরায় কোটা পদ্ধতি আংশিক চালু করলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। তাদের প্রধান দাবি ছিল:

“মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই, বৈষম্যমূলক কোটা চাই না।”

দমননীতি ও সহিংসতা

আন্দোলনের সময় পুলিশ, র‍্যাব ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু শিক্ষার্থী হতাহত হয়।

সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কারফিউ জারি করা হয়।


আন্দোলনের ফলাফল::

সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ছাড় দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা নিহত সহপাঠীদের স্মরণে আন্দোলন চালিয়ে যায়।

অনেকে জুলাই আন্দোলনকে “বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়” বলে আখ্যা দেয়।

মৃত্যুসংখ্যা: বিভিন্ন সূত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনা


বিভিন্ন সূত্রে মৃত্যুর সংখ্যা:::


Amnesty International

আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট:


Amnesty International জানিয়েছে, আন্দোলনের প্রথম দিনগুলি থেকে প্রায় ৩৯ জন নিহত হয়েছিল (জুলাই মাস শুরু থেকে)। 

তাদের বিমানতালিকা উল্লেখ করে, একদিনে ৩২ জন, এবং প্রথম ১০ দিনের মধ্যে ২০০–প্রায় শতাধিক মৃত্যু ঘটে। 



সংবাদ মাধ্যম ও অনুরূপ গণমাধ্যম রিপোর্ট:


Al Jazeera প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকদিনের মধ্যে ১০০ জনের ও বেশি মৃত্যু হয়। 

Le Monde অনুযায়ী, মাত্র ছয় দিনের মধ্যে কমপক্ষে ১৭৪ জন নিহত হন। 

Crisis Group রিপোর্টে উল্লেখ আছে, ২০০ জনের আশেপাশে নিহত হয়েছে এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছে। 



জাতিসংঘ ও উচ্চতর অনুসন্ধান রিপোর্ট:


UN Human Rights Office (OHCHR) রিপোর্ট অনুসারে, ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হতে পারে “১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট” সময়কালে। 

Wikipedia–এর “July Massacre” তথ্যসূত্র অনুযায়ী:

স্বাস্থ্য মন্ত্ণালয় অনুযায়ী: ১,০০০+

OHCHR অনুযায়ী: ১,৪০০+

Anti-discrimination Students Movement (SAD) অনুযায়ী: ১,৫৮১ জন

আহতের সংখ্যা: ২০,০০০+

এতে অন্তত ৩২ জন শিশু নিহত, ১১,০০০+ গ্রেফতার 



অন্যান্য তথ্য:


Reuters পর্যালোচনা অনুযায়ী, প্রায় ১,৫০০ জন নিহত এবং ৩,৫০০ পর্যন্ত মানুষ নিখোঁজ বা সশস্ত্র অপহরণ হতে পারে। 

CIR (Center for Investigative Reporting) তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১,০০০+ নিহত বলেছে, এই গণহত্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে বিধ্বংসী। 




---


সারাংশ: মৃত্যুর পরিসংখ্যান:


সূত্র/সংস্থা আনুমানিক মৃত্যু সংখ্যা

Amnesty International প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৯–২০০+

সংবাদমাধ্যম (Le Monde, Al Jazeera, Crisis Group) ১৭৪ – ২০০+

UN / OHCHR ১,৪০০+

SAD (ছাত্র আন্দোলন দল) ১,৫৮১

Reuters প্রায় ১,৫০০+

CIR / Interim Health Ministry ১,০০০+

---


সংক্ষেপে বলতে গেলে, নিহতদের সংখ্যার নির্ভুলতা এখনও বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন, তবে সব মিলিয়ে অন্তত কয়েকশ থেকে সাধারণ অনুমান অনুযায়ী ১,০০০–১,৫০০ বা তার বেশি হতে পারে। শিশু ও সাধারণ নাগরিকসহ সশস্ত্র ও ভিন্নতাশিশু ও সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু


জুলাই আন্দোলনে কেবল শিক্ষার্থী নয়, সাধারণ মানুষও প্রাণ হারিয়েছে।

অন্তত ৩২ জন শিশু নিহত হয়েছে।

মোট আহতের সংখ্যা ছিল ২০,০০০+।

গ্রেফতার হয়েছেন প্রায় ১১,০০০ জনের বেশি। প্রয়োগের কারণে মৃত্যুর প্রকৃতি ও সংখ্যা বিশাল আকার ধারণেছিল।


---


শেখ হাসিনার সমর্থকদের যুক্তি::


যদিও সমালোচকেরা তাঁকে ফ্যাসিস্ট বলেন, সমর্থকেরা মনে করেন শেখ হাসিনা—


পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।


নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসে অবদান রেখেছেন।


জঙ্গিবাদ দমন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন।




---


উপসংহার

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে “ফ্যাসিবাদ” শব্দটি মূলত রাজনৈতিক আখ্যা।

সমালোচকেরা বলেন, তাঁর একক শাসন, ভিন্নমত দমন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা তাঁকে ফ্যাসিস্ট নেতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি কঠোর হাতে দেশ পরিচালনা করলেও উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছেন।



👉 তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম গণতন্ত্র, অধিকার ও মেধাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সোচ্চার। তারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা মেনে নেবে না।